জেট গ্রাউটিং, প্রেশার গ্রাউটিং এবং কম্প্যাকশন গ্রাউটিং ব্যবহারের মাধ্যমে হেলে পড়া ভবনের সংশোধন ও স্থিতিশীলকরণ
ড. মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, পিইঞ্জ
- অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা, বাংলাদেশ
- ভাইস চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার রেজিস্ট্রেশন বোর্ড (বিপিইআরবি), আইইবি
Table of Contents
১. সূচনা ও প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের ভূ-তাত্ত্বিক গঠন মূলত ব্রহ্মপুত্র-পদ্মা-মেঘনা-যমুনা অববাহিকার পলিমাটি দ্বারা গঠিত, যা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বা পুরকৌশল চর্চায় এক অনন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে । রাজধানী ঢাকা এবং এর পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চল যেমন নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে মাটির স্তর বিন্যাস অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অত্যন্ত নরম কাদার (Soft Clay) উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে দ্রুত নগরায়ন, সচেতনতার অভাব এবং ভূমির সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় যথাযথ ভূ-তাত্ত্বিক পরীক্ষা বা জিওটেকনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন করে সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই মডেল টাউন অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অনেক ভবন যথাযত ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন এবং নির্মাণ না মেনে তৈরী করা হয়েছে। যার বড় প্রমাণ হলো ২০২৫ সালের নরসিংদী ভূমিকম্পে ঢাকার অনেক ভবন হেলে গেছে যদিও এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল মাত্র ৫.৫। ৬.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে এর ১০ গুণেরও বেশি লেটারাল ফোর্স আসবে ভবনগুলোতে। তখন এই ভবনগুলোর কি অবস্থা হবে আল্লাহই ভাল জানেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, এই ভবনগুলোর ফাউন্ডেশন ভূমিকম্পের ঝাঁকি সহ্য করে ঠিকে থাকার মত যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। ফলে, ফাউন্ডেশনগুলোতে অসম বসা বা ডিফারেনশিয়াল সেটেলমেন্টের (Differential Settlement) ঘটনা ঘটেছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ভবনগুলো একদিকে হেলে গেছে । ৬ এর অধিক মাত্রার ভূমিকম্প হলে এসমস্ত ভবন কাত হয়ে পড়ে যাবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
ভবন হেলে যাওয়ার অনুমোদিত সীমা আছে বিল্ডিং কোডে। অনুমোদিত সীমার মধ্যে হেলে গেলে খালি চোখে সহজে বুঝা যায় না ভবন হেলে আছে। যখন একটি ভবন তার অনুমোদিত সীমার বাইরে হেলে পড়ে, তখন এটি কেবল ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা (Structural Safety) বিঘ্নিত করে না, বরং এর অধিবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং ভবনের ব্যবহার উপযোগিতা (Serviceability) কমিয়ে দেয় । ভূ-প্রকৌশলবিদ্যায় (Geotechnical Engineering) হেলে পড়া ভবন সংশোধন করার পদ্ধতিগুলো গত কয়েক দশকে অভাবনীয় উন্নতি লাভ করেছে। প্রথাগতভাবে ব্যবহৃত জ্যাকিং বা আন্ডারপিনিং পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক গ্রাউটিং প্রযুক্তিগুলো বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হচ্ছে । জেট গ্রাউটিং, প্রেশার গ্রাউটিং এবং কম্প্যাকশন গ্রাউটিং হলো এমন তিনটি অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি যা এককভাবে বা সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে একটি হেলে পড়া ভবনকে পুনরায় সোজা করা বা আরও হেলে পড়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব । এই প্রতিবেদনটি গবেষণালব্ধ তথ্য এবং বিভিন্ন বাস্তব কেস স্টাডির ভিত্তিতে এই প্রযুক্তিগুলোর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রয়োগ বিশ্লেষণ করবে ।
১.১ বাংলাদেশে ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা কত?
আমরা প্রায় সময় এই প্রশ্নের সম্মুখীন হই। এই প্রশ্নের সোজা কোন উত্তর না থাকলেও আমাদের কাছে যে সমস্ত তথ্য আছে তা থেকে বলা যায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যে সমস্ত ফল্ট বিদ্যমান সেখানে ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা আছে যার মাত্রা হতে পারে ৫-৭ এর মধ্যে। বাংলাদেশ তিনটি টেকটোনিক প্লেটের (ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মা প্লেট) সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এটি বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। ভূতাত্ত্বিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যমান মধুপুর ফল্ট ৭.০ মাত্রার ভূমিকম্প উৎপন্ন করতে পারে এবং বাংলাদেশের উত্তরে আসামের সাথে বর্ডারে ডাউকি ফল্টে ৭.৫ মাত্রা পর্যন্ত ভূমিকম্প সৃষ্টির সক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া, উত্তর ও পূর্ব সীমান্তের সন্নিকটে আন্তর্জাতিক প্লেট বাউন্ডারিগুলোতে দীর্ঘ ৮০০-১০০০ বছর ধরে শক্তি সঞ্চিত হয়ে আছে, যা ভবিষ্যতে ৮ থেকে ৯ মাত্রার প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প ঘটাতে পারে।
বিগত ৩০০ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই অঞ্চলটি বেশ কিছু প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের সাক্ষী হয়েছে। ১৭৬২ সালের ৮.৫+ মাত্রার ভূমিকম্পে দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপ প্রায় ৩ মিটার উপরে উঠে যায়। ১৮৮৫ সালে মানিকগঞ্জ কেন্দ্রিক ৭.০ মাত্রার ‘বেঙ্গল ভূমিকম্পে’ অনেক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর ১৮৯৭ সালের ৮.০+ মাত্রার ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকুয়েক’ ঢাকা শহরসহ তৎকালীন বাংলার ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং ১,৫০০-এর বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ১৯১৮ সালের ৭.৬ মাত্রার শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্পও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিধ্বংসী প্রভাব ফেলেছিল। সাম্প্রতিক ২০২৫ সালের ৫.৫ মাত্রার নরসিংদী ভূমিকম্পে ১০ জন নিহত ও ৬২৯ জন আহত হওয়া ভবিষ্যতের বড় দুর্যোগের একটি সতর্কবার্তা।
এই অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘকাল বড় কোনো ভূমিকম্প না হওয়ায় একটি বিশাল ‘সিসমিক গ্যাপ’ বা ভূমিকম্প শূন্যতা বা প্রচুর শক্তি সঞ্চিত হয়ে আছে। সীমান্তের ওপারে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলেও মাটির গঠন ও ঘনবসতির কারণে ঢাকা শহরে এর প্রভাব হবে ভয়াবহ, যার তীব্রতা ৬-৭ মাত্রার স্থানীয় ভূমিকম্পের কম্পনের সমান হতে পারে। যদিও ভূমিকম্পের সঠিক সময় আগে থেকে বলা অসম্ভব, তবে ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের মতে একটি বড় ধরনের ভূমিকম্প এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
২. ভবন হেলে পড়ার মূল কারণসমূহ
একটি ভবন সোজা করার প্রক্রিয়া শুরু করার আগে এর হেলে পড়ার মূল কারণ বা “রুট কজ” (Root Cause) চিহ্নিত করা অপরিহার্য। মাটির প্রকৃতি এবং নির্মাণ ত্রুটির ওপর ভিত্তি করে হেলে পড়ার কারণগুলোকে প্রধান কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে।
২.১ বিষমধর্মী মৃত্তিকা বিন্যাস (Heterogeneous Subsoil Conditions)
মাটির সংকোচনশীলতা (Compressibility) যদি ভবনের ফাউন্ডেশনের নিচে সমান না হয়, তবে লোড প্রয়োগের ফলে মাটির বিভিন্ন অংশ ভিন্ন ভিন্ন হারে দেবে যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি ম্যাট ফাউন্ডেশনের একপাশে বালু এবং অন্যপাশে নরম কাদা থাকে, তবে কাদার অংশটি বেশি সংকুচিত হবে, ফলে ভবনটি সেই দিকে হেলে পড়বে। এই ধরনের মাটির স্তর বিন্যাস বাংলাদেশে অত্যন্ত সাধারণ।
২.২ পাইলের অপর্যাপ্ত গভীরতা ও ভারবহন ক্ষমতা (Inadequate Pile Embedment Depth)
বহুতল ভবনের ওজন বহনের জন্য যখন পাইলিং করা হয়, তখন পাইলের অগ্রভাগ বা পাইল টিপ (Pile Tip) অবশ্যই একটি শক্ত স্তরে (Competent Bearing Strata) পৌঁছাতে হবে। যদি পাইলগুলো পর্যাপ্ত গভীরতায় না যায় বা পাইলের ঘর্ষণজনিত বাধা (Skin Friction) অপর্যাপ্ত হয়, তবে ভবন নির্মাণের পর বা ব্যবহারের সময় এটি ধীরে ধীরে দেবে যেতে পারে। বিশেষ করে পাইলের তলা যদি নরম কাদা বা আলগা পলি স্তরে থাকে, তবে সেটেলমেন্ট অনিবার্য।
২.৩ ভূমিকম্পজনিত মৃত্তিকা তরলীকরণ (Seismic Liquefaction)
বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। ভূমিকম্পের সময় ভূগর্ভস্থ সম্পৃক্ত আলগা বালু স্তরে রন্ধ্রস্থ জলচাপ (Pore Water Pressure) অত্যন্ত বৃদ্ধি পায়, যার ফলে মাটি তার শিয়ার স্ট্রেংথ (Shear Strength) হারিয়ে তরল পদার্থের মতো আচরণ করে। একে লিকুইফ্যাকশন বলা হয়। লিকুইফ্যাকশনের ফলে ফাউন্ডেশনের ভারবহন ক্ষমতা আকস্মিকভাবে শূন্যে নেমে আসতে পারে, যা ভবনকে দ্রুত হেলে পড়তে বা মাটির নিচে দেবে যেতে বাধ্য করে।
২.৪ ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের পরিবর্তন (Groundwater Fluctuations)
অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে বা ঋতুভেদে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেলে মাটির কার্যকর চাপ (Effective Stress) বৃদ্ধি পায়। এই চাপ বৃদ্ধির ফলে মাটির কণাগুলো সংকুচিত হয়, যা মাটির উপরিভাগে সেটেলমেন্ট ঘটায়। যদি এই সেটেলমেন্ট ভবনের নিচে সমানভাবে না হয়, তবে ভবনটি টিল্টিং বা হেলে পড়ার শিকার হয়।
২.৫ পার্শ্ববর্তী নির্মাণ ও খনন কার্য (Adjacent Construction Activities)
একটি বিদ্যমান ভবনের খুব কাছে যদি গভীর বেজমেন্ট খনন (Deep Excavation) করা হয় বা ডি-ওয়াটারিং (Dewatering) করা হয়, তবে পার্শ্ববর্তী মাটির স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। পার্শ্ববর্তী খননের ফলে যদি মাটির ল্যাটারাল সাপোর্ট (Lateral Support) কমে যায়, তবে বিদ্যমান ভবনটির ফাউন্ডেশন সরে গিয়ে হেলে পড়তে পারে।
২.৬ নির্মাণ ত্রুটি ও নকশাগত দুর্বলতা (Construction Defects and Design Failures)
কখনও কখনও ভবনের আর্কিটেকচারাল লোড এবং ফাউন্ডেশনের সেন্ট্রয়েডের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি বা ইসেন্ট্রিসিটি (Eccentricity) থাকে। এছাড়াও নির্মাণকালীন গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ না করা, যেমন পাইলের কাস্টিংয়ে ত্রুটি বা ভুল জিওটেকনিক্যাল রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ডিজাইন করা, ভবন হেলে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
৩. গ্রাউটিং প্রযুক্তির রূপরেখা ও শ্রেণিবিন্যাস
গ্রাউটিং বলতে মূলত চাপের মাধ্যমে মাটির ভেতরে কোনো বিশেষ তরল বা গ্রাউট (Grout) প্রবেশ করানোকে বোঝায় যা মাটির প্রকৌশলগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে। ভবন সংশোধনের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান গ্রাউটিং পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, যেগুলোর তুলনা নিচে সারণি ১-এ দেওয়া হলো।
সারণি ১: জেট, প্রেশার এবং কম্প্যাকশন গ্রাউটিংয়ের কারিগরি তুলনা
| বৈশিষ্ট্য (Feature) | জেট গ্রাউটিং (Jet Grouting) | প্রেশার গ্রাউটিং (Pressure) | কম্প্যাকশন গ্রাউটিং (Compaction) |
|---|---|---|---|
| মূল মেকানিজম | উচ্চ গতির জেট প্রবাহের মাধ্যমে মাটির কাঠামো ভেঙে সিমেন্ট মিশ্রণ দিয়ে কলাম তৈরি। | চাপের মাধ্যমে মাটির শূন্যস্থান বা ফাটলে গ্রাউট প্রবেশ করিয়ে তা জমাটবদ্ধ করা। | অত্যন্ত ঘন গ্রাউট প্রবেশ করিয়ে মাটিকে সংকুচিত করা এবং ঘনত্ব বৃদ্ধি। |
| উপযুক্ত মৃত্তিকা | সব ধরনের মাটিতে কার্যকর, বিশেষ করে নরম কাদা ও পলি মাটিতে। | দানাদার এবং ফাটলযুক্ত শিলা বা প্রবেশ্য (Pervious) মাটি। | আলগা বালু, নরম কাদা এবং লিকুইফ্যাকশন প্রবণ মাটি। |
| গঠিত কাঠামো | ০.৬ থেকে ৫.০ মিটার ব্যাসের সয়েলক্রিট কলাম। | মাটির ভেদ্যতার ওপর নির্ভর করে নেটওয়ার্কের মতো বিস্তৃত এলাকা। | ০.৩ থেকে ১.০ মিটার ব্যাসের শক্ত গ্রাউট বাল্ব (Bulb)। |
| ব্যবহৃত ম্যাটেরিয়াল | সিমেন্ট-পানির মিশ্রণ (W/C ratio ০.৬-১.২)। | সিমেন্ট স্লারি, কেমিক্যাল গ্রাউট বা পলিউরেথেন। | কম স্ল্যাম্পের (Low slump) সিমেন্ট-বালুর ঘন মর্টার। |
| প্রধান প্রয়োগ | ফাউন্ডেশনের আন্ডারপিনিং এবং ভারবহন ক্ষমতা বৃদ্ধি। | শূন্যস্থান পূরণ, বাঁধের লিকেজ বন্ধ এবং মাটি শক্তিশালী করা। | মাটি সংকুচিত করা এবং সেটলমেন্ট হওয়া ভবন সোজা করা। |
| প্রযুক্তিগত সুবিধা | সবচেয়ে শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী কলাম তৈরি করে। | দ্রুত প্রয়োগযোগ্য এবং খরচ তুলনামূলক কম। | মাটির গভীরতায় ঘনত্ব বৃদ্ধিতে এবং লিকুইফ্যাকশন রোধে সেরা। |
৪. জেট গ্রাউটিং (Jet Grouting): নীতি, পদ্ধতি এবং প্রয়োগ
জেট গ্রাউটিং হলো একটি অত্যন্ত আধুনিক ও বৈপ্লবিক প্রযুক্তি যা মাটির ইন-সিটু (In-situ) কন্ডিশন পরিবর্তন করে একটি শক্ত মিশ্রণ তৈরি করে যা “সয়েলক্রিট” (Soilcrete) নামে পরিচিত। এটি মূলত ক্ষয় বা ইরোশন (Erosion) নীতির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। উচ্চ চাপের বাতাস বা পানির মাধ্যমে মাটিকে নরম করা হয় একই সাথে উচ্চ চাপে সিমেন্টের গ্রাউট প্রবেশ করানো হয় যা নরম মাটির সাথে মিশে যায়। এই মিশ্রণ এক মাসের মধ্যে শক্ত হয়ে সয়েলক্রিটের গ্রাউট পাইল তৈরী হয়।
৪.১ জেট গ্রাউটিংয়ের কার্যপ্রণালী (Mechanism)
এই প্রক্রিয়ায় একটি ক্ষুদ্র ব্যাসের বোরহোল ড্রিল করা হয় এবং কাঙ্ক্ষিত গভীরতায় পৌঁছানোর পর উচ্চ গতির তরল জেটের (পানি বা সিমেন্ট স্লাারি) মাধ্যমে মাটিকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করা হয়। একই সাথে সেখানে সিমেন্ট মিশ্রণ ইনজেক্ট করা হয়, যা মাটির কণার সাথে মিশে একটি সমজাতীয় এবং মজবুত কলাম তৈরি করে । এই কলামগুলো ভবনকে সরাসরি নিচ থেকে সাপোর্ট প্রদান করে এবং মাটির ওপর অর্পিত লোডকে গভীরে থাকা শক্ত স্তরে স্থানান্তর করে।
জেট গ্রাউটিংয়ের তিনটি প্রধান সিস্টেম রয়েছে:
১. সিঙ্গেল-ফ্লুইড সিস্টেম: এখানে কেবল সিমেন্ট গ্রাউটকে জেট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি সাধারণত দানাদার মাটিতে ১.২ মিটার ব্যাস পর্যন্ত কলাম তৈরি করতে পারে।
২. ডাবল-ফ্লুইড সিস্টেম: এখানে সিমেন্ট জেটের চারপাশে সংকুচিত বাতাসের একটি আবরণ (Air Shroud) থাকে, যা জেটের শক্তি বৃদ্ধি করে এবং মাটিকে আরও কার্যকরভাবে কাটতে সাহায্য করে। এতে ২.৫ মিটার ব্যাস পর্যন্ত কলাম তৈরি সম্ভব।
৩. ট্রিপল-ফ্লুইড সিস্টেম: এটি সবচেয়ে শক্তিশালী পদ্ধতি যেখানে উচ্চ গতির পানি ও বাতাসের মাধ্যমে মাটিকে আলগা করা হয় এবং নিচ থেকে আলাদাভাবে সিমেন্ট গ্রাউট প্রবেশ করানো হয়। এটি কাদা মাটিতে ৫.০ মিটার ব্যাস পর্যন্ত কলাম তৈরি করতে পারে।

৪.২ ভবন সংশোধনে জেট গ্রাউটিংয়ের ধাপসমূহ
হেলে পড়া ভবন সংশোধনের জন্য জেট গ্রাউটিং নিচের ক্রমানুসারে করা হয়:
- সাইট ইনভেস্টিগেশন: প্রথমে ভবনের নিচে মাটির ধরন এবং যে দিকে হেলে পড়েছে তার গভীরতা নির্ণয় করা হয়।
- ড্রিলিং: ক্ষুদ্র ব্যাসের (৭০-১২০ মিমি) ড্রিলিং রিগ ব্যবহার করে পাইলিংয়ের নির্দিষ্ট গভীরতা পর্যন্ত বোরিং করা হয়। অনেক সময় ভবনের ভেতরে বা সরু জায়গায় কাজ করার জন্য ছোট রিগ ব্যবহার করা হয়।
- জেটিং ও কলাম গঠন: ড্রিলিং রডটি ধীরে ধীরে ওপরে তোলা হয় এবং উচ্চ চাপে গ্রাউট ইনজেক্ট করা হয়। এর ফলে মাটির নিচে গ্রাউটেড পাইল বা সয়েলক্রিট পাইল তৈরি হয়।
- লোড ট্রান্সফার: নতুন তৈরি হওয়া পাইলগুলোর ওপর ভবনের লোড স্থানান্তর করার জন্য পাইল ক্যাপ বা রাফট ফাউন্ডেশনের সাথে সংযোগ স্থাপন করা হয়।
৪.৩ বাস্তব কেস স্টাডি: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জেট গ্রাউটিং
বিশ্বে এবং বাংলাদেশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে জেট গ্রাউটিং সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
১. আন্টালিয়া, তুরস্কে জেট গ্রাউট সংশোধন
আন্টালিয়া-কোনিয়ালটি, তুরস্কে একটি ৭-তলা ভবনের ম্যাট ফাউন্ডেশনের নীচে পরিবর্তনশীল-পুরুত্বের দুর্বল মাটির স্তরের কারণে সৃষ্ট বিষমতাভিত্তিক অবনমনের কারণে tan α = ১/১০৭ পর্যন্ত হেলে গিয়েছিল। ভবনটি স্থিতিশীল এবং সোজা করার জন্য জেট-গ্রাউটিং করা হয়। ইয়ল্দিজ টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি দ্বারা পরিচালিত সংশোধন-পরবর্তী মনিটরিং জেট গ্রাউটিং এর সফলতা এবং ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। অবনমন পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করেছে যে ভবনটি স্থিতিশীল হয়েছে, তারপরে ভবনটিতে বসবাসের অনুমতি দেয়া হয়েছে।
২. মিরপুর, ঢাকায় বি+জি+১৪ তলা আবাসিক ভবন
২৫০টি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট সহ একটি বড় কন্ডোমিনিয়াম ভবন মোট ৩০০ মিমি বিষমতাভিত্তিক অবনমনের মধ্য দিয়ে গেছে। ভবনটি একটি পুরু ম্যাট ফাউন্ডেশনের উপর নির্মিত হয়েছিল। ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার ফাউন্ডেশন ডিজাইনে একটি গুরুতর ভুল করেছিলেন। মোট ৩টি টাওয়ার (১৪ তলা) এবং একটি মসজিদ (৪ তলা) একটি একক ম্যাট ফাউন্ডেশনের উপর স্থাপন করা হয়েছিল, যেখানে মাটি বা ভার উভয়ই অভিন্ন ছিল না। ফলস্বরূপ, নির্মাণের সময়, যেখানে ম্যাট ফাউন্ডেশনের নীচে ১২ মিটার-পুরু নরম কাদা জমা রয়েছে সেখানে মোট ৩০০ মিলিমিটার বিষমতাভিত্তিক অবনমন (Differential Settlement) হয়েছে। হেলে যাওয়ার মাত্রা ছিল ১/৩০০। বেসমেন্টের দেয়ালে পানি লিকেজ এবং ফাটল দেখা দেয়। জেট গ্রাউটিং এবং কম্প্যাকশন গ্রাউটিংয়ের সমন্বয় এই ধরনের সমস্যার টেকসই সমাধান। শুধুমাত্র জেট গ্রাউটিং এই ধরনের প্রকল্পের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।
৩. নারায়ণগঞ্জ বিসিকে ৭-তলা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ভবন
ভবনের বিস্তারিত প্রকৌশল মূল্যায়নের (DEA) সময়, এটি চিহ্নিত করা হয়েছিল যে পাইল ফাউন্ডেশন এবং উপরিকাঠামো বিএনবিসি ২০২০ এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। পাইল ক্যাপের ঠিক উপরে একটি নতুন ম্যাট ফাউন্ডেশন সুপারিশ করা হয়েছিল। চ্যালেঞ্জিং অংশ ছিল নতুন নির্মিত ম্যাট ফাউন্ডেশনে ভার স্থানান্তর করা। ম্যাট ফাউন্ডেশনের নীচে প্রেসার গ্রাউটিং এবং কম্প্যাকশন গ্রাউটিং করা হয়েছিল, তাই ম্যাটটি ২-৩ মিমি উত্থিত হয়েছিল যা ম্যাটে ভার স্থানান্তর নিশ্চিত করে। গ্রাউটিংয়ের ২৮ দিন পরে ডিসিপি (DCP) পরীক্ষা করে মাটির শক্তি বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
৪. বসুন্ধরা আ/এ-তে ১০-তলা ভবন
ভবনটি পাইল ফাউন্ডেশনে নির্মিত হয়েছিল। ভবনের কিছু অংশ শুধুমাত্র এক তলা এবং মূল ভবনের সাথে একসাথে নির্মাণ করা হয়। এই এক-তলা অংশটি অগভীর ফুটিং এর উপর ছিল যার নীচে আলগা ভরাট বালি বিদ্যমান। একটি ভবনে দুই ধরনের ফাউন্ডেশন সিস্টেমের জন্য বিশেষ ডিজাইন প্রয়োজন। এখানে, বিষমতাভিত্তিক অবনমন (Differential Settlement) ঘটেছে। অগভীর ফুটিং পাইল ফাউন্ডেশনের চেয়ে বেশি অবনমিত হয়েছে। ফলস্বরূপ, ফুটিংয়ের কাছে পাইল ফাউন্ডেশন অতিরিক্ত চাপের সম্মুখীন হয়ে বিভিন্ন তলায় ফাটল পরিলক্ষিত হয়। এখানে জেট গ্রাউটিং এবং কম্প্যাকশন গ্রাউটিংয়ের সমন্বয় করে একটি সমাধান দেয়া হয়। অগভীর ফুটিং ২০ মিলিমিটারের বেশি উত্তোলন করা সম্ভব হয়েছে যা ফুটিংয়ে ভার স্থানান্তর নিশ্চিত করে।
৫. ময়মনসিংহের ত্রিশালে আকিজ কার্টুন ফ্যাক্টরি
একটি এক-তলা কারখানা শেড নরম কাদার নীচে ভরাট বালিতে নির্মিত হয়েছিল। স্টীল স্ট্রাকচার কলামগুলি পাইল ফাউন্ডেশনের উপর নির্মাণ করা ছিল। হিসাব অনুযায়ী পাইল ভারবহণ ক্ষমতা পর্যাপ্ত ছিল। তবে, নির্মাণের পরে ৫ বছর ধরে কিছু কলাম অবনমিত হচ্ছিল। ভূ-মৃত্তিকা অনুসন্ধানের পরে, এটি পাওয়া গিয়েছিল যে পাইলের তলা কাদা মাটিতে বসানো আছে। পাইল ফাউন্ডেশনের অবনমন প্রতিরোধ করতে পাইল বেস গ্রাউটিং করা হয়। পাইল বেস গ্রাউটিং করার জন্য মাটির উপরের অংশ থেকে পাইলের তলায় এঙ্গেলে একটি পাইপ ঢোকানো হয়েছিল। পাইল বেস গ্রাউটিং সম্পন্ন হওয়ার পরে, অবনমন (settlement) পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল এবং আর কোন অবনমন পরিলক্ষিত হয়নি।
৬. ময়মনসিংহের ত্রিশালে আকিজ পার্টিকেল বোর্ড ফ্যাক্টরি
একটি স্টিল স্ট্রাকচার ফ্রেম সিস্টেম যা যন্ত্রপাতি এবং পাইপগুলিতে লেটারাল সাপোর্ট প্রদান করার জন্য নির্মিত হয়েছিল এবং পাইল ফাউন্ডেশনের উপর নির্মিত হয়েছিল। তবে, যন্ত্রপাতি একটি আরসিসি স্ল্যাবের উপর স্থাপন করা হয়েছিল যার নিচে ভরাট বালি এবং নরম কাদা। স্ল্যাবের বসে যাওয়ার কারণে যন্ত্রপাতি এবং পাইপ কানেকশনে সমস্যা হচ্ছিল। এ সমস্যা সমাধানের জন্য আরসিসি স্ল্যাবের নীচে জেট গ্রাউটিং করা হয়েছিল। জেট গ্রাউটিং সম্পন্ন হওয়ার পরে, অবনমন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল এবং আর কোন অবনমন পরিলক্ষিত হয়নি।

৫. প্রেশার গ্রাউটিং (Pressure Grouting): শূন্যস্থান পূরণ ও স্থায়িত্ব বৃদ্ধি
প্রেশার গ্রাউটিং বা ইনজেকশন গ্রাউটিং হলো একটি প্রাচীন কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি যা মাটির কাঠামোগত অখণ্ডতা বাড়াতে ব্যবহৃত হয়।
৫.১ তাত্ত্বিক মূলনীতি
এই পদ্ধতিতে সিমেন্ট বা রাসায়নিক গ্রাউটকে চাপের মাধ্যমে মাটির সূক্ষ্ম ফাটল, ছিদ্র বা শূন্যস্থানে (Voids) প্রবেশ করানো হয়। গ্রাউটটি মাটির কণাগুলোর মাঝে প্রবেশ করে তাদের একে অপরের সাথে সিমেন্টের মতো আটকে দেয়। এটি মাটির প্রবেশ্যতা কমায় এবং ভারবহন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

৫.২ ভবন সংশোধনে প্রয়োগ
ভবন হেলে পড়লে অনেক সময় ফাউন্ডেশনের নিচে শূন্যস্থান বা গহ্বর তৈরি হয়। প্রেশার গ্রাউটিংয়ের মাধ্যমে সেই শূন্যস্থানগুলো ভরাট করা হয়। এটি মূলত একটি সহায়ক পদ্ধতি হিসেবে কাজ করে যা পরবর্তী ধাপে কম্প্যাকশন গ্রাউটিং বা জেট গ্রাউটিংয়ের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয় । কলকাতার হাইকোর্ট ভবনের উত্তর-পশ্চিম কোণে সেটেলমেন্ট বন্ধ করতে কনসোলিডেশন গ্রাউটিং এবং ড্রুকস্টোন (Drucstone) রাসায়নিক গ্রাউট ব্যবহারের মাধ্যমে সফলভাবে মাটিকে স্থিতিশীল করা হয়েছিল।
৬. কম্প্যাকশন গ্রাউটিং (Compaction Grouting): ভবন সোজা করার জাদুকরী কৌশল
ভবন সোজা করা বা রি-লেভেলিং (Re-leveling) করার জন্য কম্প্যাকশন গ্রাউটিং হলো বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আধুনিক ও নিরাপদ পদ্ধতি।
৬.১ কম্প্যাকশন গ্রাউটিংয়ের নীতি ও মেকানিজম (Mechanism)
এই পদ্ধতিতে অত্যন্ত ঘন এবং কম নড়াচড়া করতে পারে এমন সিমেন্ট-বালুর মর্টার উচ্চ চাপে মাটির গভীরে প্রবেশ করানো হয়। এই গ্রাউটটি মাটির সাথে মিশে যায় না বরং এটি ইনজেকশন পয়েন্টে একটি গোলাকার শক্ত বাল্ব (Bulb) তৈরি করে। বাল্বটি যত বড় হয়, এটি চারপাশের মাটিকে ঠেলে সরিয়ে দেয় এবং মাটিকে অত্যন্ত ঘন (Compacted) করে তোলে। এই পার্শ্বীয় চাপের ফলে মাটির শক্তি বাড়ে এবং যখন এই চাপ ওপরের দিকে ক্রিয়া করে, তখন এটি হেলে পড়া ভবনকে সোজা করতে সক্ষম হয়।

৬.২ রি-লেভেলিং বা ভবন সোজা করার ধাপসমূহ
১. পরিকল্পনা ও সিমুলেশন: প্রথমে ভবনের টিল্ট বা হেলে পড়ার পরিমাণ মাপা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে, PLAXIS 3D বা Geo5-এর মতো সফটওয়্যারের মাধ্যমে সিমুলেশন করে গ্রাউটিংয়ের চাপ ও গভীরতা নির্ধারণ করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ।
২. ইনজেকশন পয়েন্ট ড্রিলিং: ভবনের ডেবে যাওয়া পাশে নির্দিষ্ট দূরত্বে (সাধারণত ১.২-২.০ মিটার) ছোট ছিদ্র করা হয়। এই ছিদ্রগুলো উলম্বভাবে বা আড়াআড়িভাবে (Inclined) হতে পারে।
৩. মাটি শক্তিশালীকরণ (Soil Reinforcement Phase): প্রথম ধাপে মাটির ঘনত্ব বাড়ানো হয় যাতে এটি ভবনের লোড নিতে পারে। এতে মাটির সংকোচন ক্ষমতা বা কম্প্রেশন মডুলাস ৫ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
৪. নিয়ন্ত্রিত লিফটিং (Controlled Uplift Phase): এই ধাপে গ্রাউটিংয়ের মাধ্যমে ভবনকে ধীরে ধীরে ওপরে তোলা হয়। প্রতিটি ইনজেকশন পয়েন্টে পর্যায়ক্রমে গ্রাউট দেওয়া হয় যাতে ভবনটি সুষমভাবে ওপরে ওঠে। একটি লিফটিং সাইকেলে ভবনকে ১৫-২০ মিলিমিটারের বেশি তোলা উচিত নয়।
৬.৩ সফল কেস স্টাডি: বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ১০ তলা ভবন
বসুন্ধরার একটি ১০ তলা ভবন পাইল ফাউন্ডেশনের ওপর নির্মিত ছিল, কিন্তু এর একটি অংশ এক তলার ছিল যা শ্যালো ফুটিংয়ের ওপর ছিল। আলগা বালু স্তরের ওপর শ্যালো ফুটিং থাকায় ডিফারেনশিয়াল সেটেলমেন্টের ফলে ভবনের বিভিন্ন তলায় ফাটল দেখা দেয় । এই ক্ষেত্রে জেট গ্রাউটিং এবং কম্প্যাকশন গ্রাউটিংয়ের সমন্বয় ব্যবহার করা হয়েছে। শ্যালো ফুটিংয়ের নিচে কম্প্যাকশন গ্রাউটিং করে ভবনটিকে ২০ মিলিমিটারের বেশি ওপরের দিকে তোলা হয়েছে, যা লোড স্থানান্তর নিশ্চিত করেছে এবং ফাটলগুলো বন্ধ করতে সাহায্য করেছে।
৭. সমন্বিত গ্রাউটিং পদ্ধতি (Integrated Approach)
জটিল এবং গুরুতরভাবে হেলে পড়া ভবনের ক্ষেত্রে কেবল একটি পদ্ধতি যথেষ্ট নয়। ভূ-প্রকৌশল বিশেষজ্ঞগণ প্রায়ই একটি সমন্বিত কৌশলের সুপারিশ করেন যা তিনটি পর্যায় সম্পন্ন হয়:
- প্রথম পর্যায় (প্রেশার গ্রাউটিং): মাটির নিচের ফাঁকা জায়গাগুলো পূরণ করা।
- দ্বিতীয় পর্যায় (জেট গ্রাউটিং): ভবনের নিচে মজবুত কলাম তৈরি করে আন্ডারপিনিং করা।
- তৃতীয় পর্যায় (কম্প্যাকশন গ্রাউটিং): ডেবে যাওয়া অংশটিকে ধীরে ধীরে ওপরে তুলে ভবনটিকে সোজা করা।
এই সমন্বিত পদ্ধতিটি ফাউন্ডেশনের নিরাপত্তাকে কোনো প্রকার বিঘ্নিত না করেই ভবনকে তার আদি অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম।
৮. পরিবীক্ষণ ও যান্ত্রিক পর্যবেক্ষণ (Monitoring and Instrumentation)
ভবন সোজা করার প্রক্রিয়ায় রিয়েল-টাইম মনিটরিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাউটিং করার সময় ভবনের ভেতরে বা মাটির নিচে কী ঘটছে তা বোঝার জন্য বিভিন্ন সেন্সর ও যন্ত্র ব্যবহার করা হয়।
সারণি ২: ভবন সংশোধনে ব্যবহৃত পরিবীক্ষণ যন্ত্রপাতি
| যন্ত্রের নাম | পরিমাপকৃত প্যারামিটার | উদ্দেশ্য |
|---|---|---|
| প্রিসিশন লেভেলিং / সেটেলমেন্ট গেজ | উলম্ব বিচ্যুতি (Vertical displacement) | ভবন কতটুকু ওপরে উঠছে বা নিচে নামছে তা সুক্ষ্মভাবে মাপা । |
| টিল্টমিটার (Tiltmeter) | কৌণিক বিচ্যুতি (Angular inclination) | ভবনের হেলে থাকার পরিমাণ রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা । |
| ইনক্লিনোমিটার (Inclinometer) | মাটির পার্শ্বীয় নড়াচড়া | গ্রাউটিংয়ের ফলে মাটি পাশের দিকে সরে যাচ্ছে কি না তা পরীক্ষা করা । |
| ক্র্যাক গেজ (Crack Gauge) | ফাটলের বিস্তার | বিদ্যমান ফাটলগুলো বাড়ছে নাকি কমছে তা নিশ্চিত করা । |
| পাইজমিটার (Piezometer) | রন্ধ্রস্থ জলচাপ (Pore water pressure) | গ্রাউটিংয়ের ফলে পানির চাপের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা । |
| টোটাল স্টেশন (Total Station) | সামগ্রিক বিচ্যুতি | ভবনের ওপরের অংশের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করা । |
৯. ডিজাইন বিবেচনা ও বিএনবিসি ২০২০ (BNBC 2020) কোড
বাংলাদেশে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। হেলে পড়া ভবন সংশোধনের ক্ষেত্রেও এই কোড সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রদান করে।
৯.১ কৌণিক বিচ্যুতির অনুমোদিত সীমা
বিএনবিসি ২০২০ অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের ফাউন্ডেশনের জন্য কৌণিক বিচ্যুতি বা অ্যাঙ্গুলার ডিস্টরশন (Angular Distortion) এর সীমা নিচে সারণি ৩-এ দেওয়া হলো।
সারণি ৩: সেটেলমেন্ট ও কৌণিক বিচ্যুতির সীমা (BNBC 2020)
| ফাউন্ডেশনের ধরন | মৃত্তিকার ধরন | সর্বোচ্চ সেটেলমেন্ট (মিমি) | সর্বোচ্চ কৌণিক বিচ্যুতি (Angular Distortion) |
|---|---|---|---|
| আইসোলেটেড ফুটিং | বালি (Sand) | ৫০ মিমি | ১/৫০০ (০.০০২) |
| আইসোলেটেড ফুটিং | কাদা (Plastic Clay) | ৭৫ মিমি | ১/৫০০ (০.০০২) |
| ম্যাট ফাউন্ডেশন | বালি (Sand) | ৭৫ মিমি | ১/৩০০ (০.০০৩৩) |
| ম্যাট ফাউন্ডেশন | কাদা (Plastic Clay) | ১০০ মিমি | ১/৩০০ (০.০০৩৩) |
তবে পেশাদার প্রকৌশলীরা সাইটের বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাদের ইঞ্জিনিয়ারিং জাজমেন্ট প্রয়োগ করতে পারেন এবং প্রয়োজনে এই সীমার কিছুটা ওপরে বিচ্যুতি সহ্য করার অনুমতি দিতে পারেন, যদি তা ভবনের স্থায়িত্ব নষ্ট না করে।
৯.২ গ্রাউটিং চাপের নিয়ন্ত্রণ
গ্রাউটিং করার সময় অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে মাটি ফেটে যেতে পারে (Hydrofracture), যা ফাউন্ডেশনের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে । তাই মাটির ধরন এবং গভীরতা অনুযায়ী গ্রাউটিং চাপ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ধারণ করা উচিত। একজন জিওটেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট ছাড়া এ ধরণের কাজ করা কোন মতেই উচিত হবে না।
১০. লিকুইফ্যাকশন প্রশমন ও গ্রাউটিং প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের অনেক শহর ভূমিকম্পের সময় লিকুইফ্যাকশন বা মৃত্তিকা তরলীকরণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। জেট গ্রাউটিং এবং কম্প্যাকশন গ্রাউটিং কেবল বিদ্যমান ভবন সংশোধন করতেই নয়, বরং নতুন ভবন নির্মাণের আগে মাটির লিকুইফ্যাকশন ঝুঁকি কমাতেও অত্যন্ত কার্যকর । সয়েল-সিমেন্ট কলাম তৈরির ফলে মাটির শিয়ার মডুলাস (Shear Modulus) বৃদ্ধি পায় এবং ভূমিকম্পের সময় রন্ধ্রস্থ জলচাপ বাড়তে বাধা দেয়।
ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে গ্রাউটিং প্রক্রিয়াকে আরও সুক্ষ্ম করা সম্ভব হবে। গ্রাউটিং ডেটা লগার থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে রিয়েল-টাইমে গ্রাউটের পরিমাণ এবং চাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, যা মানুষের ভুল (Human error) কমিয়ে আনবে।
১১. উপসংহার ও সুপারিশমালা
হেলে পড়া আরসিসি ভবন সংশোধন করা একটি অত্যন্ত জটিল ভূ-কারিগরি চ্যালেঞ্জ যা গভীর জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার দাবি রাখে। এই প্রতিবেদনে আলোচিত তিনটি গ্রাউটিং পদ্ধতি — জেট গ্রাউটিং, প্রেশার গ্রাউটিং এবং কম্প্যাকশন গ্রাউটিং — বর্তমানে বাংলাদেশে সবচেয়ে নিরাপদ ও অর্থনৈতিক সমাধান হিসেবে গণ্য হচ্ছে ।
মূল সুপারিশসমূহ:
১. সঠিক রোগ নির্ণয়: ভবন কেন হেলে পড়েছে তা বোঝার জন্য অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের মাধ্যমে ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট (DEA) করাতে হবে।
২. আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ: জেট গ্রাউটিংয়ের মাধ্যমে আন্ডারপিনিং এবং কম্প্যাকশন গ্রাউটিংয়ের মাধ্যমে লিফটিং করার সমন্বিত পদ্ধতি ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ।
৩. নির্ভরযোগ্য মনিটরিং: গ্রাউটিং চলাকালীন টিল্টমিটার এবং প্রিসিশন লেভেলিংয়ের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
৪. কোড মান্যতা: প্রতিটি পদক্ষেপে বিএনবিসি ২০২০ এর গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে যাতে ভবনের আইনি ও কারিগরি বৈধতা বজায় থাকে।
৫. প্রশিক্ষিত জনবল: এই ধরনের সংবেদনশীল কাজে অবশ্যই দক্ষ এবং অভিজ্ঞ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও পরামর্শক নিয়োগ করা উচিত।
পরিশেষে, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের মতো পলিমাটির দেশেও হেলে পড়া ভবনগুলোকে পুনরুদ্ধার করে দীর্ঘস্থায়ী ও নিরাপদ করে তোলা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের উদ্ভাবনী গবেষণা এবং বাস্তব প্রয়োগ এ ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
Works cited
- Cost Effective Foundation Solution – Jet Grouting, accessed March 1, 2026, https://jetgrouting.com.bd/jet-grouting/
- Rectification_of_Tilted_RCC_Building 01-03-2026.docx
- Profile of Md. Jahangir Alam – Department of Civil Engineering, BUET, accessed March 1, 2026, https://ce.buet.ac.bd/profile-of-md-jahangir-alam/
- Response of multistory steel structure subjected to differential settlements of its foundation – Ingenta Connect, accessed March 1, 2026, https://www.ingentaconnect.com/content/mcb/ijsi/2021/00000013/00000004/art00002
- A Review of Jet Grouting Practice and Development – Scribd, accessed March 1, 2026, https://www.scribd.com/document/564467266/A-review-of-jet-grouting-practice-and-development
- Investigating a hybrid extreme learning machine coupled with Dingo Optimization Algorithm for modeling liquefaction triggering in sand-silt mixtures – PMC, accessed March 1, 2026, https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC11088631/
- BNUS ANNUAL REPORT-2022, accessed March 1, 2026, https://ohow.iis.u-tokyo.ac.jp/wp-content/uploads/2023/06/Report-2022-23-.pdf
- EXPERIMENTAL INVESTIGATION OF EMBANKMENT ON SOFT SOIL UNDER CYCLIC LOADING: EFFECT OF INPUT ACCELERATION, accessed March 1, 2026, http://103.99.128.19:8080/xmlui/bitstream/handle/123456789/205/PDF_GE.pdf?sequence=2&isAllowed=y
- Three-Dimensional Response of the Supported-Deep Excavation System: Case Study of a Large Scale Underground Metro Station – ResearchGate, accessed March 1, 2026, https://www.researchgate.net/publication/339364216_Three-Dimensional_Response_of_the_Supported-Deep_Excavation_System_Case_Study_of_a_Large_Scale_Underground_Metro_Station
- Design of deep excavation with secant pile wall: a case study on performance of structure | Request PDF – ResearchGate, accessed March 1, 2026, https://www.researchgate.net/publication/392115420_Design_of_deep_excavation_with_secant_pile_wall_a_case_study_on_performance_of_structure
- 5 BNBC Part6 Chap 3 Print | PDF | Deep Foundation | Geotechnical Engineering – Scribd, accessed March 1, 2026, https://www.scribd.com/document/366287107/5-BNBC-Part6-Chap-3-Print
- Advances in Grouting Technology | PDF | Silicon Dioxide | Cement – Scribd, accessed March 1, 2026, https://www.scribd.com/document/333264235/AVS-Grouting-Practice
- Compaction Grouting vs Jet Grouting – Ground Improvement Guide, accessed March 1, 2026, https://www.superiorgrouting.com/blog/compaction-grouting-vs-jet-grouting-ground-improvement-guide/
- Ground Modification Methods Reference Manual – Volume I, accessed March 1, 2026, https://istasazeh-co.com/pdf/Ground-Modification-Methods.pdf
- Pre-qualification – Spectra Geotechnologies Foundations Contracting, accessed March 1, 2026, http://www.spectrageotech.com/images/pdf/Grouting-Ground-Treatments.pdf
- diesel jet grouting pump–Leadcrete engineering machinery, accessed March 1, 2026, https://www.leadcrete.net/engineeringmachinery/diesel-jet-grouting-pump.html
- Environmental impact assessment Report, accessed March 1, 2026, https://objectstorage.ap-dcc-gazipur-1.oraclecloud15.com/n/axvjbnqprylg/b/V2Ministry/o/office-doe/2024/12/f67bd85ced5b44c9aae10a370f834edd.pdf
- Diesel driven jet grouting plant–Leadcrete engineering machinery, accessed March 1, 2026, https://www.leadcrete.net/engineeringmachinery/diesel-driven-jet-grouting-plant.html
- FOCUSING ON SAFETY FOR MORE THAN 10 YEARS… – EIMS, accessed March 1, 2026, https://www.eimslbd.com/pdf/profile2021.pdf
- Jet grouting equipment–Leadcrete engineering machinery, accessed March 1, 2026, https://www.leadcrete.net/engineeringmachinery/jet-grouting-equipment.html
- Jahangir Alam PhD Professor at Bangladesh University of Engineering and Technology – ResearchGate, accessed March 1, 2026, https://www.researchgate.net/profile/Md-Alam-248
- (PDF) Settlement Analysis of Field Monitoring Data at Kanchpur Bridge, Bangladesh, accessed March 1, 2026, https://www.researchgate.net/publication/360289644_Settlement_Analysis_of_Field_Monitoring_Data_at_Kanchpur_Bridge_Bangladesh
- Training Module on COMPREHENSIVE LANDSLIDES RISK MANAGEMENT – NIDM, accessed March 1, 2026, https://nidm.gov.in/pdf/modules/landslide.pdf
- Himalayan Landslides-Causes and Evolution – DPNet Nepal, accessed March 1, 2026, https://dpnet.org.np/uploads/files/HimalayanLandslides-CausesandEvolution-SandeepSingh2022%202022-08-01%2006-19-54.pdf
- RELIABLE INSTRUMENTATION & DATA MONITORING SOLUTIONS GEOTECHNICAL | GEODETIC | STRUCTURAL – Encardio Rite, accessed March 1, 2026, https://www.encardio.com/wp-content/uploads/2019/08/Encardio-Rite_Consolidated-Catalog-2018-19.pdf
- LANDSLIDES: INVESTIGATION AND MITIGATION – Transportation Research Board (TRB), accessed March 1, 2026, https://onlinepubs.trb.org/Onlinepubs/sr/sr247/sr247.pdf
- Overview of Landslide Hazard and Risk Practices in India – NGI, accessed March 1, 2026, https://www.ngi.no/globalassets/bilder/prosjekter/safeland/rapporter/d2.2b.pdf
- বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (BNBC): কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ, accessed March 1, 2026, https://www.compliancebd.xyz/2025/10/Bangladesh-National-Building-Code-BNBC.html
- Bangladesh National Building Code 2020 | PDF | Regulatory Compliance – Scribd, accessed March 1, 2026, https://www.scribd.com/document/498861646/Bangladesh-National-Building-Code-2020
- BNBC Part-1 | PDF | Building | Grammatical Gender – Scribd, accessed March 1, 2026, https://www.scribd.com/document/399179677/BNBC-PART-1
- University of Delhi MoEF&CC & Ors. BEFORE THE HON’BLE NATIONAL GREEN TRIBUNAL Principal Bench, New D, accessed March 1, 2026, https://www.greentribunal.gov.in/sites/default/files/news_updates/Report%20by%20CPCB%20in%20Appeal%20No.%20112%20of%202018%20(University%20of%20Delhi%20Vs.%20MoEF&CC%20&%20Ors.).pdf
- Part 5, Subpart 5-1 Standards for Water Wells – Appendix 5B, accessed March 1, 2026, https://www.health.ny.gov/regulations/nycrr/title_10/part_5/appendix_5b.htm
- Bearing Capacity and Liquefaction Assessment of Shallow Foundations Resting on Vibro-Stone Column Densified Soil in Vallur Oil Terminal, India | Request PDF – ResearchGate, accessed March 1, 2026, https://www.researchgate.net/publication/372780155_Bearing_Capacity_and_Liquefaction_Assessment_of_Shallow_Foundations_Resting_on_Vibro-Stone_Column_Densified_Soil_in_Vallur_Oil_Terminal_India
- Reliability Analysis of Stone Columns Improved Ground for Mitigation of Liquefaction | Request PDF – ResearchGate, accessed March 1, 2026, https://www.researchgate.net/publication/396349619_Reliability_Analysis_of_Stone_Columns_Improved_Ground_for_Mitigation_of_Liquefaction